আঙ্কটাডের পূর্বাভাস

২০২৫ সালেও বিশ্বব্যাপী বিদেশী বিনিয়োগে পতন অব্যাহত থাকবে

টানা তৃতীয় বছরের মতো ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মোট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে পতন অব্যাহত থাকবে।

টানা তৃতীয় বছরের মতো ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী মোট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহে পতন অব্যাহত থাকবে। এক পূর্বাভাসে ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড) বলেছে, এ পতনের প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্রের উসকে দেয়া চলমান বাণিজ্যিক উত্তেজনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা। খবর আরব নিউজ।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী উৎপাদনশীল এফডিআই প্রবাহ ১১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছিল ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন বা দেড় লাখ কোটি ডলারে।

পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার কারণে এফডিআইয়ের বেশির ভাগ গুরুত্বপূর্ণ সূচক এখন নিম্নমুখী। এর মধ্যে রয়েছে এফডিআই প্রত্যাশা, মূলধন গঠন, পণ্য ও সেবার রফতানি, আর্থিক বাজারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগ মনোভাব।

বিশ্বব্যাংক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলেছে, গত বছরের আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এফডিআই প্রবাহ ৪৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে নেমে এসেছিল, যা ২০০৫ সালের পর সর্বনিম্ন। এছাড়া উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয়ও ওই বছর এফডিআই প্রবাহ কমে ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছে, যা ১৯৯৬ সালের পর সর্বনিম্ন। যার প্রধান কারণ বাণিজ্য বাধা বৃদ্ধি। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মেরুকরণ।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘আমরা এমন সময় পার করছি যখন বিশ্বব্যাপী আরো সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সুযোগ সম্প্রসারণ করা উচিত ছিল। কিন্তু এর উল্টোটা দেখছি।’

তার মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাধা বেড়ে চলেছে। বিশ্বায়ন পিছু হটছে। টেকসই উন্নয়নের ওপর এর গভীর প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে অবকাঠামো বিনিয়োগ ধীর হচ্ছে। বিনিয়োগ চাপে পড়েছে শিল্প খাতে। সবচেয়ে বেশি এফডিআই যাদের প্রয়োজন, সে উন্নয়নশীল দেশগুলো পিছিয়ে পড়ছে। আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ‘বর্ধিত বাণিজ্য উত্তেজনা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক বিভাজন বিনিয়োগ পরিবেশকে আরো খারাপ দিকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।’

ভৌগোলিকভাবে এফডিআই প্রবাহ সবচেয়ে বেশি কমেছে ইউরোপে। অঞ্চলটিতে গত বছর মোট এফডিআই প্রবাহ দাঁড়ায় ১৮ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৫৮ শতাংশ কম। অন্যদিকে উত্তর আমেরিকায় এফডিআই বেড়ে ৩৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি।

গত বছর উন্নয়নশীল এশিয়ায় এফডিআইর প্রবাহ ছিল ৬০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩ শতাংশ কম। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে মোট এফডিআই প্রবাহ ১২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে। তবে আফ্রিকায় এফডিআই প্রবাহ ৭৫ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ৭০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

সব মিলিয়ে উন্নত অর্থনীতির মধ্যে ইউরোপে এফডিআই প্রবাহে তীব্র পতনের বিপরীতে উত্তর আমেরিকায় বিনিয়োগ বেড়েছে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি সত্ত্বেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সামগ্রিক প্রবাহ ছিল স্থির।

চলতি মাসের শুরুতে বৈশ্বিক ঋণমান সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল জানায়, বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৫ সালে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) অঞ্চলে এফডিআই প্রবাহ ধীর হবে। মার্কিন বাণিজ্যনীতির পরিবর্তন, জ্বালানি তেলের মূল্যে পতন ও অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যায়ন প্রকল্পে ধীরগতির কারণে এমনটা ঘটবে।

আঙ্কটাড বলছে, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রকল্প অর্থায়নেও পতন অব্যাহত ছিল। ওই সময় আগের বছরের তুলনায় অর্থায়ন কমেছে ২৬ শতাংশ। বড় উন্নয়ন প্রকল্পে এফডিআই থেকে বেশির ভাগ অর্থায়ন পেয়ে থাকে কম উন্নত দেশগুলো। তাই এ সংকোচনে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জাতিসংঘের সংস্থাটির মহাসচিব রেবেকা গ্রিনস্প্যান বলেন, ‘বৈশ্বিক অর্থনীতি বর্তমানে নানা ধরনের জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর মধ্যে রয়েছে ঋণের বোঝা বৃদ্ধি, নিম্নমুখী জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রবাহে কাঠামোগত পরিবর্তন।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্প খাতে ঘোষিত নতুন (গ্রিনফিল্ড) প্রকল্পের সংখ্যা বছরে ৩ শতাংশ বাড়লেও এগুলোর মোট মূল্য ৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি ডলার দাঁড়িয়েছে।

উন্নত দেশগুলোয় এফডিআই প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখে অধিগ্রহণ ও একীভূতকরণ (এমঅ্যান্ডএ) চুক্তি। গত বছর এ ধরনের চুক্তিমূল্য ১৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। তবে এটি এক দশকের গড়ের নিচে।

আঙ্কটাড বলছে, এমঅ্যান্ডএর বাজারে সামগ্রিক দুর্বলতা রয়েছে। নীতিগত ঝুঁকি ও নিয়ন্ত্রকের তদারকি বাড়তে থাকায় অভ্যন্তরীণ চুক্তি ও কাছাকাছি অঞ্চলে অধিগ্রহণ বাড়ছে। অন্যদিকে ক্রস-বর্ডার চুক্তির অনুপাত কমছে।

তবে ২০২৪ সালে একমাত্র ডিজিটাল অর্থনীতিই প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। এ সময় প্রকল্পের সংখ্যা ১৭ শতাংশ বেড়েছে এবং মোট বিনিয়োগ দ্বিগুণ হয়েছে। রেবেকা গ্রিনস্প্যান বলেন, ‘ডিজিটাল অর্থনীতি বার্ষিক ১০-১২ শতাংশ হারে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি।’

তবে ডিজিটাল অর্থনীতির এ প্রবৃদ্ধি সবার অঞ্চলে সমানভাবে হচ্ছে না। গত পাঁচ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ডিজিটাল অর্থনীতিতে ৫০ হাজার কোটি ডলারের বেশি গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগ হয়েছে, কিন্তু এর বেশির ভাগই কিছু নির্দিষ্ট দেশে কেন্দ্রীভূত।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সংক্রান্ত খাতগুলোর বিনিয়োগ বাধার সম্মুখীন হয়েছে। ২০২৪ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রকল্প কমেছে ১২ শতাংশ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদে বিনিয়োগ প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে।

আরও